মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মুজিবনগর

মুজিবনগর প্রতিনিধি: আজ ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাঙ্গালী জাতির এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। ২১৬ বছর পর ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল পলাশীর আম্রকাননের অদূরে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা আম্রকাননে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হয়।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল দিনটি ছিল শনিবার । বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহনের ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। পাক বাহিনীর বিমান হামলার আশংকায় এই গোপনীয়তা । শুধুমাত্র তখন কলকাতায় প্রেসক্লাবে হাজির থাকতে বলা হয়। সকাল ৬টার মধ্যেই কলকাতা প্রেসক্লাবে কয়েকশ বিদেশী ও ভারতীয় সাংবাদিক এবং টিভি ক্যামেরাম্যান ভিড় জমায়। বাংলাদেশের পক্ষে একজন কর্মকর্তা প্রেসক্লাবে হাজির হয়ে সাংবাদিকদের স্বাগত জানান। তিনি সাংবাদিকদের আগাম কোন কিছু না জানিয়ে শুধুমাত্র তাদের গাড়ি অনুসরণ করতে অনুরোধ করেন। সাংবাদিকগণ তখনও জানেন না, যে তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক দুলর্ভ ঘটনার মুজিবনগর সংবাদ কভার করতে যাচ্ছে। কলকাতা শহর পার হয়ে গাড়ির বহর কৃষ্ণনগর শহর অভিমুখে রওনা হয়। তারপর কৃষ্ণনগর পার হয়ে বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে যাইতে থাকে । দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গাড়ির বহর আঁকাবাঁকা কাঁচা পথ ধরে বাংলাদেশের ভিতর প্রবেশ করে। এক সংঙ্গে মেটো পথে এত গাড়ি চলায় চারিদিক ধূলায় আচ্ছাদিত হয়ে যায়। সবাই হাজির হলেন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার বিশাল আমবাগানে । এককালের এক হিন্দু জমিদারের এই আমবাগানের নতুন নাম করণ করা হয় মুজিবনগর। সকাল হতে বিশাল ছায়াবন আমবাগানে উৎসুক জনতার ভিড়। খালি গায়ে ছেলেরা বসে আসে আমবাগানের গাছের ডালে ডালে। কিন্তু কেউই জানে না, তারা কি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে । সেখানে সবাই পৌছানোর পর জানতে পারলেন বিষয়টি।
১৯৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর এমনি এক আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। ঠিক এর ২১৪ বছর পর পলাশীর অদুরে আরেক আমবাগানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হতে যাচ্ছে। আম বাগানের চারিদিকে রাইফেল হাতে কড়া প্রহরা বসিয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। উৎসাহী জনতা দেখছে ঐতিহাসিক মুহুর্তটি। টিভি ও ফটো সাংবাদিকরা মন ভরে ছবি তুলছেন। মুক্ত আকাশের নিচে চৌকি পেতে তৈরি করা হয়েছে শপথ মঞ্চ। মঞ্চের উপর সাজানো ৬ খানা চেয়ার । বামপাশে কয়েকখানা চেয়ার ছিল সাংবাদিকদের জন্য। অনুষ্ঠানের প্রবেশ পথে বাংলায় লেখা মুজিবনগর স্বাগতম। স্থানীয় সময় বেলা ১১টা বেজে ৫০ মিনিটে নতুন রাষ্ট্রের নেতারা জীপে চড়ে এলেন । জনতা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে উল্লাস করলো মুিজবনগরের আমবাগান। মঞ্চে উঠে এলেন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম । তার পিছনে তাজউদ্দিন আহমেদ ,খন্দকার মোশতাক আহমেদ ,এ এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও জেনারেল এজি ওসমানি। আসন গ্রহণপর্ব শেষে অনুষ্ঠানসূচী ঘোষনা করলেন এম এ মান্নান । বর্তমানে মুজিবনগর ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক বাকের আলির পবিত্র কোরআন তেলায়াতের মাধ্যমে মুল অনুষ্ঠান শূরু হয় । আওয়ামীলীগের সংসদীয় দলের চীফ হুইপ ইউসুফ আলি ঐতিহাসিক দলিল স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র পাঠ করেন। এর সাথে সাথে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী পদে তাজউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে খন্দকার মোসতাক আহমেদ,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে এইচ এম কামরুজ্জামান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে ক্যাপ্টেন মনসুর আলির নাম ঘোষনা করেন। আর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ পদে যথাক্রমে এজি ওসমানী ও জেনারেল আব্দুর রবের নিয়োগের ঘোষনা দেয়া হলো। এরপর নতুন সরকার অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীবর্গ ও সেনাবাহিনী প্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলি । তবে এ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান উপস্থিত না থাকলেও বার বার উচ্চারিত হয় তার নাম। শপথ গ্রহনের পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবর্গকে একদল মুক্তিযোদ্ধা আনসার তেজোদ্দীপ্ত ভঙ্গীতে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনমুজিবনগর আম্রকানন আহমেদ বলেন, আমরা যা কিছু করেছি সবই মুজিবের নির্দেশে। এ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন মেহেরপুরের মরহুম অধ্যাপক আসাদুল হক, পিন্টু বিশ্বাস, শাহাবদ্দিন সেন্টু প্রমুখ। এ অনুষ্ঠান থেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মন্ত্রী বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রাষ্ট্রের কুটনৈতিক স্বীকৃতি দান ও সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান। বাংলাদেশের ১৬৯ জন জাতীয় সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৬৭ জন উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক সরকার গঠনের পর সকলেই ভারতে চলে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *