ঐতিহাসিক মুজিবনগর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্যবাহী পালকি

শাকিল রেজাঃ   বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে, তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে। আর পালকি চলে, পালকি চলে, গগণতলে আগুন জ্বলে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিশুতোষ এই কবিতাসহ পালকি নিয়ে আরও অনেক গান, ছড়া ও কবিতা লেখা থাকলেও এক সময় তা বাস্তব ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে ঐতিহাসিক মুজিবনগর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্যবাহী পালকি। পালকি গ্রাম বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বাহন।
এটা ছাড়া বিয়ের কথা ভাবাই যেত না। প্রথমে বরকে পালকিতে করে তার নিজ বাড়ি থেকে কনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হতো। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর বর-কনেকে একসঙ্গে আবার বরের
বাড়িতে নিয়ে আসত।এছাড়াও  এই বাহনে ১ বা ২ জন যাত্রী নিয়ে  দুই জন, চার জন অথবা আট জন বাহক এটিকে কাঁধে তুলে একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়।অনেকের কাছে এখন শুধুই স্মৃতি। বর-কনে বহনে পাল্টেছে যান। পালকির পরিবর্তে এসেছে নানা বাহন। পালকির পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে প্রাইভেটকার , মাইক্রো কিংবা ঘোড়ার গাড়িসহ নানা যানবাহন।    পালকি শব্দটি বাংলার সংস্কৃতি ‘পল্যঙ্ক’ বা ‘পর্যঙ্ক’ থেকে এসেছে।
আধুনিক যানবাহন আবিষ্কৃত হওয়ার আগে অভিজাত শ্রেণির লোকেরা পালকিতে চড়েই যাতায়াত করতেন। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিয়েতে ও অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠানে বর-কনের জন্য পালকি ব্যবহারের প্রথা চালু ছিল। এমনকি শুভ নববর্ষ আসলেই শুরু হত পালকি নিয়ে বর কনের খেলা। গ্রামেগঞ্জে বিয়ে হলেই বর-কনেকে পালকিতে তুলে বেহারারা গান গাইতে গাইতে নিয়ে আসতেন, এ দৃশ্য দেখে সবাই খুব আনন্দ করতো, সেই সুখস্মৃতি যেন মানুষের মনে এখনও জেগে আছে। এখন আর পালকি দেখা যায় না। কালের বিবর্তনে বাংলার এ প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। পালকি বিভিন্ন আকৃতি ও ডিজাইনের হয়ে থাকে। পালকি বহনের সময় তারা বিশেষ ছন্দে গান গেয়ে থাকেন। তাদের চলার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গানের তাল-লয়ও পরিবর্তিত হয়। কাঠমিস্ত্রিরা সেগুন কাঠ, শিমুল কাঠ দিয়েও পালকি তৈরি করতেন। বটগাছের বড় ঝুরি দিয়ে তৈরি হয় পালকির বাঁট । পালকি সচরাচর তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- সাধারণ পালকি, আয়না পালকি এবং ময়ূরপঙ্খী পালকি।  সবচেয়ে ছোট পালকি ‘ডুলি’ বহন করে দুই বেহারা। বড় পালকি চলে চার বেহারা ও আট বেহারায়। কালের পরিবর্তনে পালকি আজ আর দেখা যায় না।কালের বিবর্তনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পালকি আজ বিলুপ্তির পথে।এক সময় শুধু বিয়ের বাহন নয়, অভিজাত শ্রেণীর মানুষ ও রাজাদেরও প্রধান বাহন ছিল পালকি। সেই পালকির ছিল কত রূপ! কত না বাহার!  গ্রামের পথে ভেসে আসত ‘হুনহুনা’ ‘হুনহুনা’ ধ্বনি। তালে তালে পা ফেলে, সুরেলা ছন্দময় ধ্বনি ছড়িয়ে তারা পালকিতে বয়ে নিচ্ছেন নববধূ কিংবা বর। রঙিন ঝালর দেয়া আর নানা রঙের ফুল ও কাগজে সাজানো পালকির ভেতর ঘোমটা দেয়া বধূর মুখখানি দেখতে আশপাশের মানুষ এসে দাঁড়ান রাস্তার পাশে। লাজুক মুখে নববধূও দরজার ফাঁক দিয়ে চোখ ফেলেন বাইরে। এখন আর সেই আবিষ্ট করা হুনহুনা ধ্বনি শোনা যায় না কোথাও। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমাগত প্রসার, সড়ক ও নদীপথে মোটর ও অন্যান্য যান জনপ্রিয় হওয়ার ফলে পালকির কদর কমে যেতে থাকে।পালকি হয়তো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। হয়তো বা পেশা বদলাবে পালকির বাহক বেয়ারাদের। আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে পালকি হয়তো হারাবে না কোনোদিন। কারণ পালকিই তো প্রথম এবং ভ্রাম্যমাণ বাসর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *